মর্টগেজ থাকলে হজ করা

মর্টগেজ থাকলে হজ করা যায় কি?

হজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। এটি প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের জন্য জীবনে একবার ফরজ। তবে আধুনিক আর্থিক দায়বদ্ধতার যুগে একটি সাধারণ প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খায়:

👉 “মর্টগেজ থাকলে কি হজ করা জায়েজ?”

এই ব্লগ পোস্টে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে—তাও বিস্তারিতভাবে। আমরা আলোচনা করব হজ করার শর্ত, মর্টগেজের প্রভাব, বিভিন্ন মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি, আর্থিক পরিকল্পনা, এবং হজ ২০২৫-এর প্রস্তুতি।

হজ ফরজ হওয়ার শর্ত: আর্থিক সক্ষমতা

শরিয়তে হজ ফরজ হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। তার মধ্যে আর্থিক সক্ষমতা (ইস্তিতাআ) অন্যতম প্রধান।

এই সক্ষমতার অর্থ:

  • নিজের এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে
  • ঋণমুক্ত হয়ে
  • হজের সম্পূর্ণ খরচ বহনের সক্ষমতা থাকা

এখন প্রশ্ন হলো, মর্টগেজ এই সমীকরণে কোথায় আসে?

মর্টগেজ কী? ইসলাম কী বলে?

মর্টগেজ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, সাধারণত বাড়ি কেনার জন্য নেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতে সুদ (রিবা) জড়িত, যা ইসলাম অনুযায়ী হারাম।

✅ কিছু দেশ বা অঞ্চলে শরিয়াহ-সম্মত মর্টগেজ (ইসলামিক হোম ফাইন্যান্স) পাওয়া যায় — যেমন: মুরাবাহা, ইজারা বা মুশারাকা ভিত্তিক।

❌ কিন্তু যেসব দেশে শরিয়াহ-সম্মত অপশন নেই, সেখানে অনেক মুসলমান বাধ্য হয়ে সাধারণ সুদভিত্তিক মর্টগেজ নিতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে অনেকের প্রশ্ন জাগে — মর্টগেজ থাকলে হজের বিধান কী?

মর্টগেজ থাকলে কি হজ করা জায়েজ?

মর্টগেজ থাকা অবস্থায় হজ করার ব্যাপারে ফিকহে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও, অধিকাংশ আলেম কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে জায়েজ মনে করেন:

✅ ১. আপনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন

যদি আপনি নির্ধারিত কিস্তি ঠিকভাবে পরিশোধ করে চলছেন এবং হজের খরচ বহনের পরও আর্থিকভাবে কোনো চাপ না হয়—তাহলে হজ ফরজ হয়েছে এবং আপনি তা আদায় করতে পারবেন।

✅ ২. পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন

আপনার পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রেখে হজ করছেন—এক্ষেত্রে এটি বৈধ।

✅ ৩. সুদের জন্য তাওবা করছেন

যদি আপনার মর্টগেজ সুদভিত্তিক হয়, তাহলে হজে যাওয়ার আগে আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত। পাশাপাশি সম্ভব হলে শরিয়াহ-সম্মত বিকল্প খুঁজুন।

✅ ৪. দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হজের পথে বাধা নয়

মর্টগেজ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হওয়ায়, তা হজ করার পথে বাধা নয় যদি আপনি ঋণ নিয়মিত শোধ করছেন এবং হজের খরচ বহন করতে পারছেন।

আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

চারটি মূল মাজহাব—হানাফি, মালিকি, শাফি’ঈ ও হাম্বলি—এই বিষয়ে মোটামুটি একমত যে:

  • মর্টগেজ থাকা অবস্থায় হজ জায়েজ, যদি আর্থিক সমস্যা না হয়
  • হজের খরচ পরিশোধ এবং কিস্তি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলে হজ আদায় করা যাবে
  • সুদের জন্য তাওবা আবশ্যক, তবে এটি হজ বাতিল করে না

হজ করতে চাইলে মর্টগেজের সঙ্গে কিভাবে সামঞ্জস্য করবেন?

📌 ১. বাজেট রিভিউ করুন

আপনার মাসিক বাজেট বিশ্লেষণ করুন। দেখুন—মর্টগেজের কিস্তি, দৈনন্দিন খরচ, এবং সঞ্চয় ঠিক আছে কি না।

📌 ২. আলাদা হজ ফান্ড তৈরি করুন

মাসে মাসে কিছু অর্থ হজের জন্য জমাতে থাকুন। এতে আপনার মূল বাজেট ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

📌 ৩. ঋণ নিয়ে হজ করবেন না

নতুন ঋণ নিয়ে হজ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। চেষ্টা করুন নিজস্ব অর্থেই হজ করার।

📌 ৪. আলেম ও ফাইনান্স এক্সপার্টের পরামর্শ নিন

ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক ফতোয়া ও পরিকল্পনা পেতে একজন মুফতি ও আর্থিক পরামর্শদাতার সাহায্য নিন।

হজ ২০২৫: নতুন নিয়ম ও প্রস্তুতি

সৌদি সরকার ২০২৫ সালের হজের জন্য কিছু নতুন বিধি চালু করেছে:

  • কঠোর ভিসা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া
  • নির্ভরযোগ্য হজ এজেন্সি বাধ্যতামূলক
  • স্বাস্থ্য সনদ ও টিকা বাধ্যতামূলক

✅ প্রস্তুতির জন্য করণীয়:

  • বিশ্বস্ত ট্যুর অপারেটর নির্বাচন করুন
  • ইহরামের নিয়ম ও আনুষ্ঠানিকতা শিখে নিন
  • হজ বাজেট ও জরুরি তহবিল আলাদা রাখুন
  • মানসিকভাবে হজের জন্য প্রস্তুত হোন

সাধারণ ভুল যেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত

অতিরিক্ত খরচ – হজের সময় অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও বিলাসিতা থেকে বিরত থাকুন।

ঋণ নিয়ে হজ – নতুন ঋণ নিয়ে হজ করা ইসলামি দৃষ্টিতে সঠিক নয়।

ইহরামের নিয়ম না জানা – অজ্ঞতার কারণে ভুল হলে ইবাদত নষ্ট হতে পারে।

অপরিকল্পিত যাত্রা – যাচাই-বাছাই না করে যাত্রা করা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঋণ এবং হজ

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি ঋণ নিয়ে তা পরিশোধের নিয়ত না করে, আল্লাহ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।”
📚 সহিহ বুখারী

তাই, মর্টগেজ থাকলে নিশ্চিত করুন আপনি পরিশোধের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা রাখছেন এবং সেই সঙ্গেই হজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

❓ মর্টগেজ থাকলে কি হজ ফরজ?

✔️ হ্যাঁ—যদি আপনি কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন এবং পরিবারের চাহিদা পূরণ করে হজ করতে পারেন, তাহলে হজ ফরজ।

❓ সুদভিত্তিক মর্টগেজ থাকলে হজ জায়েজ?

✔️ হ্যাঁ—তবে তাওবা করা জরুরি। শরিয়াহ সম্মত বিকল্প খোঁজা উত্তম।

❓ মর্টগেজ না শোধ করেই হজ করলে হজ কবুল হবে?

✔️ হ্যাঁ—হজ কবুল হওয়া আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। আপনি যদি নিয়ত বিশুদ্ধ রাখেন এবং আর্থিকভাবে সক্ষম হন, তাহলে ইনশাআল্লাহ কবুল হবে।

উপসংহার

মর্টগেজ থাকা অবস্থায় হজ করা ইসলামে জায়েজ—যদি আপনি আর্থিকভাবে সক্ষম হন এবং মর্টগেজের কিস্তি ঠিকভাবে পরিশোধ করছেন। তবে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন এবং হজের জন্য সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নিন।

হজ শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ নয়, এটি আত্মশুদ্ধির পথ। তাই আপনার মনোযোগ হোক শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে।

আপনি কি মর্টগেজ থাকা অবস্থায় হজ করার কথা ভাবছেন? নিচে মন্তব্য করুন বা আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন। এই পোস্টটি শেয়ার করুন পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে এবং আরও ইসলামিক নির্দেশনার জন্য আমাদের ওয়েবসাইটে নিয়মিত ভিজিট করুন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *