কীভাবে হজ্জ করবেন: সম্পূর্ণ গাইড
হজ্জ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো হজ্জ। এটি এমন একটি পবিত্র তীর্থযাত্রা, যা প্রত্যেক সক্ষম মুসলিমের জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক। হজ্জ পালনের জন্য মুসলিমদের সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে যেতে হয়, যেখানে অবস্থিত পবিত্র কাবা শরীফ। কাবা শরীফকে ইসলামের সর্বাপেক্ষা পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই ইবাদতের সময় মুসলিমরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্ম সম্পন্ন করে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে কাবা শরীফের চারপাশে সাতবার তাওয়াফ, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ানো (সাঈ), আরাফাতের ময়দানে দোয়া করা, মুজদালিফায় রাতযাপন করা এবং মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ ও কুরবানি প্রদান। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ বা ১৩ তারিখের মধ্যে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
তবে হজ্জ কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়। এটি আল্লাহর প্রতি গভীর ভক্তি প্রকাশ, আত্মত্যাগের প্রতীক, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের নিদর্শন এবং পাপমুক্তির এক অনন্য সুযোগ। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মুসলিম একত্রিত হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন।
এই গাইডে সহজ ভাষায় জানানো হবে কীভাবে হজ্জে যাওয়া যায়, কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সঠিকভাবে কীভাবে হজ্জের ইবাদত সম্পন্ন করা উচিত।
হজ্জে যাওয়ার জন্য কারা যোগ্য
হজ্জ করা ফরজ তাদের জন্য যারা সক্ষম। সক্ষম বলতে বোঝায়:
- শারীরিক সক্ষমতা: আপনার শরীর এতটা সুস্থ হতে হবে যে আপনি মক্কায় যাতায়াত ও হজ্জের কাজ (যেমন অনেক হাঁটা) করতে পারেন।
- আর্থিক সক্ষমতা: হজ্জের খরচ, যেমন ভিসা, টিকিট, থাকা-খাওয়ার টাকা, আপনার থাকতে হবে। এছাড়া, পরিবারের খরচের জন্য টাকা রেখে যেতে হবে।
- মানসিক প্রস্তুতি: হজ্জ একটি বড় ইবাদত। আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং হজ্জের নিয়ম শিখতে হবে।
- মাহরাম (মহিলাদের জন্য): মহিলাদের হজ্জে যেতে হলে মাহরাম (বাবা, ভাই, স্বামী বা ছেলে) থাকতে হবে।
হজ্জে যাওয়ার ধাপসমূহ
হজ্জে যাওয়ার জন্য কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হবে। এগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. হজ্জের নিয়ম শেখা
হজ্জের আগে আপনাকে এর নিয়ম শিখতে হবে। হজ্জের প্রধান কাজগুলো হলো:
- ইহরাম: হজ্জ শুরু করার আগে বিশেষ পোশাক পরা এবং নিয়ত করা। পুরুষরা দুটি সাদা কাপড় পরেন, আর মহিলারা ঢিলেঢালা পোশাক পরেন।
- তাওয়াফ: কাবা শরীফের চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করা।
- সাঈ: সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ানো।
- আরাফাতে দোয়া: জিলহজের ৯ম দিনে আরাফাতের ময়দানে দোয়া করা।
- মুজদালিফায় রাত্রিযাপন: আরাফাতের পর মুজদালিফায় রাত কাটানো এবং পাথর সংগ্রহ করা।
- মিনায় পাথর নিক্ষেপ ও কুরবানি: মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করা এবং কুরবানি দেওয়া।
এই নিয়ম শিখতে আপনি মসজিদের ইমাম বা হজ্জ প্রশিক্ষণ ক্লাসে যোগ দিতে পারেন। বাংলাদেশে হজ্জ অফিস বা এজেন্সি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।
২. হজ্জ ভিসার জন্য আবেদন
হজ্জে যেতে হলে সৌদি আরবের হজ্জ ভিসা লাগবে। বাংলাদেশে আপনি এটি পেতে পারেন:
- ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়: বাংলাদেশ সরকারের হজ্জ অফিসের মাধ্যমে সরকারি হজ্জ প্যাকেজে নিবন্ধন করতে পারেন।
- হজ্জ এজেন্সি: বেসরকারি হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে ভিসার জন্য আবেদন করা যায়।
- নুসুক প্ল্যাটফর্ম: সৌদি সরকারের নুসুক নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে, যেখানে আপনি ভিসা, থাকার জায়গা এবং বাসের ব্যবস্থা করতে পারেন।
ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
- বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাসের মেয়াদ থাকতে হবে)।
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড)।
- স্বাস্থ্য সার্টিফিকেট (মেনিনজাইটিস ও ফ্লু টিকা নিতে হবে)।
- মাহরামের তথ্য (মহিলাদের জন্য)।
- নিবন্ধন ফি।
৩. আর্থিক প্রস্তুতি
হজ্জে যাওয়ার খরচ অনেক। বাংলাদেশে হজ্জের খরচ নির্ভর করে সরকারি বা বেসরকারি প্যাকেজের উপর:
- সরকারি প্যাকেজ: ৪-৬ লাখ টাকা।
- বেসরকারি প্যাকেজ: ৬-১০ লাখ টাকা।
এই খরচের মধ্যে ভিসা ফি, বিমান টিকিট, মক্কায় থাকা, খাবার, বাস এবং কুরবানির খরচ থাকে। আপনি নিজে পরিকল্পনা করলে খরচ কম হতে পারে, তবে এটি বেশি সময় ও পরিশ্রম লাগে।
৪. শারীরিক প্রস্তুতি
হজ্জে অনেক হাঁটতে হয়, দিনে ৫-১৫ কিলোমিটার। তাই আপনাকে শরীর তৈরি করতে হবে:
- প্রতিদিন ৩০-৬০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করুন।
- মেনিনজাইটিস ও ফ্লু টিকা নিন।
- মক্কায় গরম থাকে (৩৫-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস), তাই গরমে হাঁটার অভ্যাস করুন।
- হজ্জের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে যদি আপনার কোনো রোগ থাকে।
৫. পোশাক ও সরঞ্জাম
হজ্জের জন্য বিশেষ পোশাক ও সরঞ্জাম লাগবে:
- পুরুষদের জন্য: ইহরামের জন্য দুটি সাদা, সেলাইবিহীন কাপড়। আরামদায়ক স্যান্ডেল কিনুন।
- মহিলাদের জন্য: ঢিলেঢালা পোশাক, যেমন বোরকা বা হিজাব, যা পুরো শরীর ঢাকে। মুখ ঢাকার নিকাব ইহরামে নিষেধ।
- অন্যান্য সরঞ্জাম: পানির বোতল, ছাতা (গরমের জন্য), হালকা ব্যাগ, ওষুধ, সানগ্লাস এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
৬. মাহরামের ব্যবস্থা (মহিলাদের জন্য)
মহিলাদের হজ্জে যেতে মাহরাম লাগবে। আপনার বাবা, ভাই, স্বামী বা ছেলে মাহরাম হতে পারেন। তাদের সাথে পরিকল্পনা করুন এবং ভিসার সময় তাদের তথ্য দিন।
৭. হজ্জ প্যাকেজ বা নিজে পরিকল্পনা
আপনি দুইভাবে হজ্জে যেতে পারেন:
- হজ্জ প্যাকেজ: এজেন্সি ভিসা, টিকিট, থাকা, খাবার এবং বাসের ব্যবস্থা করে। এটি সহজ, তবে খরচ বেশি।
- নিজে পরিকল্পনা: আপনি নিজে ভিসা, হোটেল এবং বাসের ব্যবস্থা করতে পারেন। এটি কম খরচে হতে পারে, তবে বেশি সময় ও পরিশ্রম লাগে।
হজ্জের সময় কী করবেন
হজ্জে গিয়ে আপনি নিচের কাজগুলো করবেন:
- ইহরাম বাঁধা: মক্কায় পৌঁছানোর আগে মীকাত নামে নির্দিষ্ট স্থানে ইহরামের পোশাক পরে নিয়ত করবেন।
- তাওয়াফ: মসজিদুল হারামে গিয়ে কাবার চারপাশে সাতবার তাওয়াফ করবেন।
- সাঈ: সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাতবার দৌড়াবেন।
- আরাফাতে দাঁড়ানো: জিলহজের ৯ম দিনে আরাফাতের ময়দানে দোয়া করবেন। এটি হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- মুজদালিফায় রাত্রিযাপন: আরাফাতের পর মুজদালিফায় রাত কাটাবেন এবং মিনার জন্য পাথর সংগ্রহ করবেন।
- মিনায় কাজ: মিনায় তিনটি স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করবেন এবং কুরবানি দেবেন।
- শেষ তাওয়াফ: হজ্জ শেষে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন।
হজ্জের সময় চ্যালেঞ্জ
হজ্জে যাওয়া সহজ নয়। কিছু চ্যালেঞ্জ হতে পারে:
- ভিড়: মক্কায় লক্ষ লক্ষ মানুষ থাকেন। তাই ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
- গরম আবহাওয়া: মক্কায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। পানি পান করুন এবং ছাতা ব্যবহার করুন।
- স্বাস্থ্য ঝুঁকি: মেনিনজাইটিস বা ফ্লুর মতো রোগ ছড়াতে পারে। টিকা নিন এবং মাস্ক পরুন।
- ভিসার কোটা: সৌদি সরকার প্রতি দেশের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক ভিসা দেয়। তাই দেরি করলে সুযোগ হারাতে পারেন।
খরচ কমানোর উপায়
হজ্জের খরচ কমানোর কিছু উপায়:
- আগে থেকে জমানো: প্রতি মাসে টাকা জমান। ব্যাংকের হজ্জ সঞ্চয় স্কিমে যোগ দিতে পারেন।
- সাশ্রয়ী প্যাকেজ: সরকারি প্যাকেজ সাধারণত বেসরকারি প্যাকেজের চেয়ে সস্তা।
- নিজে পরিকল্পনা: হোটেল, বাস বা খাবার নিজে ব্যবস্থা করলে খরচ কম হতে পারে।
- গ্রুপে যাওয়া: পরিবার বা বন্ধুদের সাথে গেলে খরচ ভাগাভাগি করা যায়।
হজ্জের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
হজ্জ শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার একটি উপায়। হজ্জের সময় আপনি তাওয়াফ, দোয়া এবং কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, যিনি সঠিকভাবে হজ্জ করেন, তিনি নবজাতকের মতো পাপমুক্ত হন। হজ্জে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের সাথে ইবাদত করা আপনার ঈমানকে শক্তিশালী করবে।
হজ্জের জন্য সৌদি আরবের ব্যবস্থা
সৌদি আরব সরকার হজ্জের জন্য বড় ব্যবস্থা করে। তারা মক্কা, আরাফাত, মুজদালিফা এবং মিনায় তাঁবু, বাস, নিরাপত্তা এবং হাসপাতাল দেয়। নুসুক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আপনি ভিসা, হোটেল এবং বাস বুক করতে পারেন। সৌদি সরকার ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে প্রতি ১০০০ মুসলিমের জন্য একটি ভিসা দেওয়া হয়।
উপসংহার
হজ্জে যাওয়া একটি বড় দায়িত্ব এবং পবিত্র ইবাদত। এটি করতে হলে আপনাকে হজ্জের নিয়ম শিখতে হবে, ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে, শারীরিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নিতে হবে এবং মাহরামের ব্যবস্থা করতে হবে (মহিলাদের জন্য)। হজ্জ প্যাকেজ বা নিজে পরিকল্পনা করে যাওয়া যায়। আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে এই ইবাদত সহজ ও আনন্দদায়ক হবে। হজ্জ আপনার জীবনকে আল্লাহর পথে আরও কাছে নিয়ে যাবে।কল টু অ্যাকশন: আপনি যদি হজ্জে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে মসজিদের ইমাম বা কোনো আলেমের সাথে কথা বলুন। বাংলাদেশের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (www.hajj.gov.bd) দেখুন বা নুসুক প্ল্যাটফর্মে হজ্জ ভিসার জন্য আবেদন করুন। হজ্জ প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত হন এবং দোয়া করুন যেন আল্লাহ আপনার হজ্জ কবুল করেন।







