হজ্জে ইহরাম কী এবং এর গুরুত্ব কী?
হজ্জ ইসলামের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের অন্যতম। সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ্জ পালন করা ফরজ। এটি একটি পবিত্র ভ্রমণ, যেখানে মুসলমানরা মক্কায় কাবা শরীফের চারপাশে নির্দিষ্ট নিয়মে ইবাদত করেন। হজ্জের শুরুতেই হাজিদের ইহরামে প্রবেশ করতে হয়, যা এর প্রথম ধাপ। এই ব্লগে সহজভাবে তুলে ধরা হচ্ছে ইহরামের সংজ্ঞা, নিয়ম এবং এর গুরুত্ব।
হজ্জ ও ইহরামের ভূমিকা
মক্কায় কাবা শরীফের চারপাশে বিশেষ নিয়মে ইবাদত করার মাধ্যমে হজ্জ পালন হয়। এটি জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। হজ্জের বিভিন্ন ধাপের মধ্যে ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং কোরবানি রয়েছে। ইহরামই হাজিদের জন্য প্রস্তুতির সূচনা করে।
ইহরাম কী?
‘ইহরাম’ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছু ‘নিষিদ্ধ করা’ বা ‘পবিত্র অবস্থায় প্রবেশ’। হজ্জ বা উমরাহ করার সময় মুসলমানরা বিশেষ সাদা কাপড় পরেন এবং নিয়ত করেন। এই পোশাকের সঙ্গে ইবাদতের নিয়ত মিলিয়ে যা তৈরি হয়, সেটাই ইহরাম।
হাজি যখন ইহরাম পরেন, তখন কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত মেনে চলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ইহরামের মাধ্যমে শুরু হয় এই পবিত্র যাত্রা।
ইহরামের দুটি অংশ:
- পোশাক: পুরুষদের জন্য ইহরাম হলো দুটি সাদা, সেলাইবিহীন কাপড়। একটি কাপড় কোমরে জড়ানো হয়, আরেকটি কাঁধের উপর রাখা হয়। মহিলাদের জন্য ইহরাম হলো সাধারণ, পরিষ্কার এবং শালীন পোশাক, যা পুরো শরীর ঢাকে।
- নিয়ত: ইহরামের জন্য মনে মনে হজ্জ বা উমরাহ করার ইচ্ছা করতে হয়। এটি একটি আধ্যাত্মিক প্রতিজ্ঞা, যার মাধ্যমে হাজি আল্লাহর ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন।
ইহরাম শুরু হয় মক্কার কাছাকাছি কিছু নির্দিষ্ট জায়গায়, যেগুলোকে বলা হয় মিকাত। মিকাতে পৌঁছে হাজিরা ইহরাম পরেন এবং নিয়ত করেন।
ইহরামের নিয়ম কী কী?
ইহরামের সময় হাজিদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়। এই নিয়মগুলো মানা খুবই জরুরি, কারণ এগুলো হজ্জের পবিত্রতা বজায় রাখে। নিচে ইহরামের প্রধান নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
১. শারীরিক নিয়ম
- চুল বা নখ কাটা যাবে না: ইহরামের সময় চুল, দাড়ি বা নখ কাটা নিষিদ্ধ।
- সুগন্ধি ব্যবহার নিষিদ্ধ: হাজিরা সুগন্ধি, পারফিউম বা সুগন্ধযুক্ত সাবান ব্যবহার করতে পারেন না।
- শিকার করা নিষিদ্ধ: ইহরামের সময় কোনো প্রাণী শিকার করা বা হত্যা করা যায় না।
- যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ: ইহরামের সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো যৌন সম্পর্ক বা সম্পর্কিত কথাবার্তা নিষিদ্ধ।
২. আচরণগত নিয়ম
- ঝগড়া বা খারাপ কথা নিষিদ্ধ: ইহরামের সময় কোনো ঝগড়া, গালি বা খারাপ কথা বলা যায় না। হাজিদের শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকতে হবে।
- মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ: সত্য কথা বলতে হবে এবং কোনো ধরনের মিথ্যা বা প্রতারণা থেকে দূরে থাকতে হবে।
- আল্লাহর জিকির: ইহরামের সময় বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করতে হয়, বিশেষ করে তালবিয়া পড়তে হয়। তালবিয়া হলো:
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।”
এর অর্থ: “আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই। সব প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই।”
৩. পোশাকের নিয়ম
- পুরুষদের জন্য: পুরুষদের দুটি সাদা, সেলাইবিহীন কাপড় পরতে হয়। এই পোশাক সহজ এবং সাধারণ, যা দেখায় যে আল্লাহর কাছে সবাই সমান।
- মহিলাদের জন্য: মহিলাদের শালীন, পূর্ণ শরীর ঢাকা পোশাক পরতে হয়। মুখ ও হাত ছাড়া সব অংশ ঢেকে রাখতে হবে।
- জুতা: পুরুষরা এমন জুতা বা স্যান্ডেল পরবেন, যা পায়ের উপরের অংশ খোলা রাখে। মহিলারা সাধারণ জুতা পরতে পারেন।
ইহরাম কোথায় এবং কীভাবে শুরু হয়?
ইহরাম শুরু হয় মিকাত নামে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে। মিকাত হলো মক্কার চারপাশে কয়েকটি সীমানা, যেখানে হাজিরা ইহরাম পরেন। মিকাতের কয়েকটি জায়গা হলো:
- জুল হুলাইফা: মদিনা থেকে আসা হাজিদের জন্য।
- জুহফা: সিরিয়া বা মিশর থেকে আসা হাজিদের জন্য।
- যালামলাম: ইয়েমেন থেকে আসা হাজিদের জন্য।
- কারনুল মানাযিল: নজদ থেকে আসা হাজিদের জন্য।
মিকাতে পৌঁছে হাজিরা নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করেন:
- গোসল করা: ইহরামের আগে গোসল করে শরীর পবিত্র করতে হয়।
- ইহরামের পোশাক পরা: পুরুষরা দুটি সাদা কাপড় এবং মহিলারা শালীন পোশাক পরেন।
- নিয়ত করা: মনে মনে হজ্জ বা উমরাহ করার ইচ্ছা করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, হজ্জের জন্য নিয়ত হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ফায়াসসিরহু লি ওয়া তাকাব্বালহু মিন্নি।” (অর্থ: হে আল্লাহ! আমি হজ্জ করতে চাই, এটি আমার জন্য সহজ করুন এবং আমার কাছ থেকে কবুল করুন।)
- তালবিয়া পড়া: নিয়তের পর তালবিয়া পড়া শুরু করতে হয়।
ইহরামের গুরুত্ব কী?
ইহরাম হজ্জের প্রথম ধাপ এবং এটি হজ্জের পবিত্রতার প্রতীক। ইহরামের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
১. আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি
ইহরামের মাধ্যমে হাজি নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করেন। এটি তাদের মনে একটি পবিত্র মনোভাব তৈরি করে এবং তাদের পাপ থেকে মুক্তির জন্য প্রস্তুত করে।
২. সমতার প্রতীক
ইহরামের পোশাক দেখায় যে আল্লাহর কাছে সবাই সমান। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সবাই একই সাদা পোশাক পরেন। এটি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।
৩. আত্ম-নিয়ন্ত্রণ
ইহরামের নিয়মগুলো হাজিদের ধৈর্য ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ শেখায়। উদাহরণস্বরূপ, ঝগড়া না করা বা সুগন্ধি ব্যবহার না করা হাজিদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের গুণ তৈরি করে।
৪. আল্লাহর প্রতি সমর্পণ
ইহরামের মাধ্যমে হাজি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সমর্পণ প্রকাশ করেন। তালবিয়া পড়ার মাধ্যমে তারা বারবার বলেন যে তারা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
ইহরামের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবে?
ইহরাম হজ্জের প্রথম ধাপ, তাই এর জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এখানে কিছু টিপস দেওয়া হলো:
১. শারীরিক প্রস্তুতি
- ইহরামের আগে গোসল করে শরীর পবিত্র করো।
- হালকা ও আরামদায়ক পোশাক প্রস্তুত রাখো। পুরুষদের জন্য সাদা, সেলাইবিহীন কাপড় এবং মহিলাদের জন্য শালীন পোশাক নির্বাচন করো।
- আরামদায়ক জুতা বেছে নাও, যা হজ্জের সময় হাঁটার জন্য উপযোগী।
২. মানসিক প্রস্তুতি
- ইহরামের নিয়মগুলো আগে থেকে শিখে নাও। এটি তোমাকে সঠিকভাবে ইহরাম পালন করতে সাহায্য করবে।
- হজ্জের সময় ধৈর্যশীল ও শান্ত থাকার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হও।
৩. তালবিয়া ও দোয়া শেখা
- তালবিয়া মুখস্থ করো এবং এর অর্থ বোঝো। এটি ইহরামের সময় বারবার পড়তে হবে।
- কিছু সাধারণ দোয়া শিখে নাও, যেমন: “আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি।” (অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন ও আমার উপর রহম করুন।)
৪. মিকাত সম্পর্কে জানা
- তুমি কোথা থেকে মক্কায় যাচ্ছ, তার উপর নির্ভর করে তোমার মিকাত নির্ধারিত হবে। মিকাত সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নাও।
ইহরাম সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য
- ইহরামের পোশাক সাদা হওয়ার কারণ হলো এটি পবিত্রতা ও সরলতার প্রতীক।
- ইহরামের সময় হাজিরা তালবিয়া এত জোরে পড়েন যে পুরো এলাকা এই ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
- ইহরামের নিয়মগুলো হাজিদের জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ শেখায়।
ইহরামের পর কী হয়?
ইহরামের পর হাজিরা মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ করেন, যেখানে তারা কাবা শরীফের চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। এরপর তারা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার হাঁটেন, যাকে বলা হয় সাঈ। এরপর হজ্জের অন্যান্য ধাপ, যেমন আরাফাতে অবস্থান, কোরবানি এবং তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন হয়।
উপসংহার
ইহরাম হজ্জের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এটি শুধু একটি পোশাক বা নিয়ম নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা, যা হাজিদের আল্লাহর কাছে সমর্পণের প্রতীক। ইহরামের মাধ্যমে হাজিরা তাদের হজ্জের যাত্রা শুরু করেন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রস্তুত হন। এই ব্লগে আমরা ইহরামের নিয়ম, গুরুত্ব এবং প্রস্তুতি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছি, যাতে তুমি সহজে বুঝতে পারো।
ইহরাম সম্পর্কে আরও জানতে চাও? নিচে কমেন্ট করে তোমার প্রশ্ন জানাও! এই ব্লগটি তোমার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করো, যাতে তারাও ইহরামের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে। হজ্জের অন্যান্য ধাপ সম্পর্কে জানতে আমাদের অন্যান্য ব্লগ পড়তে ভুলো না!
ইংরেজীতে ব্লগ পড়তে : www.ziyarahbd.com
আরো পড়ুন:
১. হজ্জের সময় মারা গেলে কী হয়? ইসলামে এর অর্থ ও করণীয়







