Arafa

হজ্জে আরাফাত কী এবং এর গুরুত্ব কী?

হজ্জ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি, যা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জীবনে অন্তত একবার পালন করা ফরজ। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে বেশ কয়েকটি ধাপ রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল আরাফাতের দিন। এই ব্লগে সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় বোঝানো হয়েছে ;

আরাফাত কী, হজ্জের কোন অংশে এটি অন্তর্ভুক্ত, আর কেন এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

হজ্জ কী এবং আরাফাতের ভূমিকা কী?

হজ্জ মূলত মক্কার কাবা শরীফের চারপাশে নির্দিষ্ট নিয়মে ইবাদত করার একটি পবিত্র ধর্মীয় ভ্রমণ। প্রতি বছর ইসলামী মাস জিলহজের ৮ম থেকে ১২তম দিন পর্যন্ত এই হজ্জ অনুষ্ঠিত হয়। হজ্জের ধাপগুলোর মধ্যে আছে ইহরাম,

তাওয়াফ,

সাঈ,

আরাফাতে অবস্থান,

কোরবানি ইত্যাদি।

এর মধ্যে আরাফাতের দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।

আরাফাত কী?

আরাফাত হলো মক্কার কাছাকাছি প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের একটি বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ। এটি একটি পাহাড়ি অঞ্চলও, যেখানে জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড় অবস্থিত। “আরাফাত” নামটি এসেছে আরবি শব্দ “আরাফা” থেকে, যার অর্থ “জানা” বা “চেনা”।

এই স্থানের পেছনে রয়েছে একটি গভীর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।প্রতিবছর জিলহজের ৯ তারিখে, লক্ষ লক্ষ হাজি এখানে সমবেত হন। এই দিনটিকে আরাফাতের দিন বলা হয় এবং এই দিনেই হাজিরা ওকুফে আরাফাত সম্পন্ন করেন, যা ছাড়া হজ্জ পূর্ণ হয় না।

এই ব্লগে আরাফাতের বিস্তারিত বর্ণনা ও এর গুরুত্ব সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, আরাফাতের মাঠে আদম (আ:) এবং হাওয়া (আ:) পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। এই কারণে এই জায়গাটি “চেনার” বা “মিলনের” প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

হজ্জের সময় এই মাঠে লক্ষ লক্ষ হাজি একত্রিত হন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।

আরাফাতের দিন কী ঘটে?

জিলহজের ৯ তারিখে হাজিরা আরাফাতের মাঠে যান। এই দিনটি হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। হাজিরা সকাল থেকে আরাফাতে পৌঁছান এবং দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এখানে থাকেন। এই সময়টাকে বলা হয় ওকুফে আরাফাত

ওকুফ মানে দাঁড়িয়ে থাকা বা অবস্থান করা। এই সময় হাজিরা আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, ক্ষমা চান এবং তাঁর রহমত কামনা করেন।

ওকুফে আরাফাত কীভাবে করা হয়?

  • সময়: ওকুফ জোহরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত করা হয়। এটি জিলহজের ৯ তারিখের দুপুর থেকে শুরু হয়।
  • কী করতে হয়: হাজিরা আরাফাতের মাঠে দাঁড়িয়ে বা বসে আল্লাহর জিকির করেন। তারা তালবিয়া পড়েন, যা হলো:
    “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।”
    এছাড়া তারা কুরআন তিলাওয়াত করেন, দোয়া পড়েন এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা চান।
  • জায়গা: হাজিরা আরাফাতের মাঠের যেকোনো জায়গায় দাঁড়াতে পারেন। অনেকে জাবালে রহমতের কাছে যান, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

ওকুফে আরাফাত হজ্জের মূল অংশ। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “হজ্জ হলো আরাফাত।” এর মানে হলো, আরাফাতে অবস্থান না করলে হজ্জ পূর্ণ হয় না।

আরাফাতের দিনের গুরুত্ব কী?

আরাফাতের দিনকে ইসলামে খুবই পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:

১. ক্ষমা প্রাপ্তির দিন

আরাফাতের দিন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সেরা সময়। মুসলমানরা বিশ্বাস করেন যে এই দিনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পাপ ক্ষমা করেন। এই কারণে হাজিরা এই দিনে বেশি বেশি দোয়া করেন এবং তওবা করেন।

২. আল্লাহর নৈকট্য লাভ

আরাফাতে দাঁড়িয়ে হাজিরা আল্লাহর সঙ্গে একটি আধ্যাত্মিক সংযোগ অনুভব করেন। এটি তাদের ঈমানকে আরও শক্তিশালী করে। এই সময় হাজিরা নিজেদের জীবনের ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত হন এবং নতুন জীবন শুরু করার প্রতিজ্ঞা করেন।

৩. ঐক্য ও সমতার প্রতীক

আরাফাতের মাঠে লক্ষ লক্ষ হাজি একত্রিত হন। তারা সবাই একই পোশাক (ইহরাম) পরেন, যা দেখায় যে আল্লাহর কাছে সবাই সমান। ধনী-গরিব, ছোট-বড় কোনো পার্থক্য থাকে না। এটি মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগায়।

৪. ঐতিহাসিক তাৎপর্য

আরাফাতের দিন ইবরাহিম (আ:), হাজরা (আ:) ও ইসমাইল (আ:)–এর ত্যাগ এবং ঈমানের শক্ত বিশ্বাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

এ ছাড়া, এই পবিত্র ময়দানে রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর বিদায়ী হজ্জের বিখ্যাত ভাষণ প্রদান করেছিলেন, যা ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরাফাতের পর কী হয়?

আরাফাতের দিন সূর্যাস্তের পর হাজিরা মুজদালিফায় যান। মুজদালিফা হলো আরাফাত ও মিনার মাঝখানে একটি জায়গা। এখানে তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান এবং ফজরের নামাজ পড়েন।

এই সময় তারা ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করেন, যা পরে জামারাতে পাথর নিক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হয়।

মুজদালিফার পর হাজিরা মিনায় যান, যেখানে তারা ঈদুল আজহার দিনে কোরবানি করেন এবং জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করেন। এরপর তারা মক্কায় ফিরে তাওয়াফে জিয়ারত করেন। এভাবে হজ্জের অন্যান্য ধাপগুলো সম্পন্ন হয়।

আরাফাতের দিনের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবে?

আরাফাতের দিনটি হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন, তাই এর জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এখানে কিছু টিপস দেওয়া হলো:

১. শারীরিক প্রস্তুতি

  • আরাফাতে অনেক সময় দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে হয়। তাই শরীরকে ফিট রাখার জন্য আগে থেকে হাঁটার অভ্যাস করো।
  • গরম আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকো। পানি, ছাতা এবং হালকা খাবার সঙ্গে রাখো।

২. মানসিক প্রস্তুতি

  • আরাফাতের দিন অনেক মানুষের ভিড় থাকে। তাই ধৈর্য ধরে শান্ত থাকার চেষ্টা করো।
  • এই দিনে আল্লাহর কাছে কী চাইবে, তা আগে থেকে ভেবে রাখো।

৩. দোয়া ও জিকির শেখা

  • আরাফাতে দোয়া করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখে নাও। তালবিয়া, কুরআনের আয়াত এবং অন্যান্য জিকির মুখস্থ করো।
  • ক্ষমা প্রার্থনার জন্য বিশেষ দোয়া শিখে নাও, যেমন: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউজুবিকা মিনান নার।”

৪. নিয়ম জানা

  • আরাফাতে কী কী করতে হবে এবং কী কী করা যাবে না, তা আগে থেকে জেনে নাও। উদাহরণস্বরূপ, ইহরামের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে।

আরাফাত সম্পর্কে কিছু তথ্য

  • আরাফাতের মাঠে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ একত্রিত হন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশগুলোর একটি।
  • জাবালে রহমত পাহাড়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর বিদায়ী হজ্জের ভাষণ দিয়েছিলেন।
  • আরাফাতের দিনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাছাকাছি আসেন এবং তাদের দোয়া কবুল করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

আরাফাতের দিনে কী কী দোয়া পড়বেন?

আরাফাতের দিনে হাজিরা বিভিন্ন দোয়া পড়েন। এখানে কয়েকটি সাধারণ দোয়া দেওয়া হলো:

  • তালবিয়া: এটি হজ্জের সময় বারবার পড়া হয়।
    “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”
  • ক্ষমা প্রার্থনা: “আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনি ওয়া আফিনি ওয়ারজুকনি।”
    এর অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার উপর রহম করুন, আমাকে সুস্থ রাখুন এবং আমাকে রিজিক দিন।”
  • দরূদ শরীফ: রাসূলুল্লাহ (সা:) এর উপর দরূদ পড়া খুবই ফজিলতপূর্ণ।

এছাড়া তুমি নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারো। নিজের এবং পরিবারের জন্য ভালো কিছু চাও।

উপসংহার

আরাফাতের দিন হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দিনে হাজিরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তাঁর রহমত কামনা করেন এবং নিজেদের জীবনের জন্য দোয়া করেন। আরাফাত শুধু একটি মাঠ নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার কেন্দ্র, যেখানে মুসলমানরা আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন।

আরাফাত সম্পর্কে আরও জানতে চাও? নিচে কমেন্ট করে তোমার প্রশ্ন জানাও! এই ব্লগটি তোমার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করো, যাতে তারাও আরাফাতের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।

হজ্জের অন্যান্য ধাপ সম্পর্কে জানতে আমাদের অন্যান্য ব্লগ পড়তে ভুলো না!

ইংরেজীতে ব্লগ টি পড়তে ক্লিক করুন www.ziyarahbd.com

আরো পড়ুন:

১. কীভাবে হজ্জ করবেন: সম্পূর্ণ গাইড

২. হজে কতটি পাথর নিক্ষেপ করতে হয়? | রমি জামারাতের নিয়ম

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *